ডেনাইট সংবাদ » সাংবাদিকতা পেশা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে

২৫শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং | ১২ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

234-60

সাংবাদিকতা পেশা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে

প্রকাশিত হয়েছে: বুধবার, ২৭, মার্চ, ২০১৩ ১১:২২ অপরাহ্ণ
সাংবাদিকতা পেশা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে

প্রবীণ সাংবাদিকরা (নেতারা) সাংবাদিকতা পেশা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।প্রায়ই বলাবলি করেন, একসময় সাংবাদিক সংগঠনকে দেশের সব সংগঠন সমীহ করত। তারা এ সংগঠনের কর্মসূচিগুলো ফলো করত। তারা সাংগঠনিক সমস্যা সমাধানে এখানে ছুটে আসতেন। সাংবাদিকরা একটা মর্যাদাগত অবস্থানে ছিলেন। যৌথ কোনো কর্মসূচিতে সাংবাদিক নেতাদের অবস্থান ছিল ঈর্ষণীয়। কালক্রমে সেটা লোপ পেয়েছে অনেকটা। বিভক্তি সাংবাদিকদের মর্যাদা ও শক্তি ক্ষয় হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ না থাকায় বুদ্ধিভিত্তিক পেশার অগ্রসর সৈনিকরা আজ অনেকটা অসহায়। হৃত গৌরব ও শক্তি ফিরে পেতে মাঝেমধ্যে উদ্যোগ পরিলক্ষিত হলেও অপশক্তির কাছে বারবার সুন্দর, কল্যাণকর ও শুভক্ষণগুলো হারিয়ে যায়। সাংবাদিক সমাজের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে আত্মঘাতী কাজ একশ্রেণীর নেতা অজ্ঞাত কারণে করেই যাচ্ছেন। আর এর মাসুল দিচ্ছেন সর্বসত্মরের সাংবাদিকরা। কিন্তু এটা আর কত।

সাংবাদিকতা পেশা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। শনির দশা যেন সাংবাদিকদের পিছু ছাড়ছে না। এককের পর সমস্যা সামনে চলে আসছে। এর মধ্য নিরাপত্ত সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রত্যেকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার অধ্যায়ের ৩৯(১) এবং ২-এর ক ও খ ধারায় এই নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে যতই নিশ্চয়তা দেওয়া হোক না কেন, বর্তমান অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। সরকার নিজেই রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে মিডিয়া দলন করছে বলে দল-মত নির্বিশেষে সাংবাদিক নেতারা মনে করছেন।

আজ অকাতরে সাংবাদিক, সংবাদকর্মী, সম্পাদক রাষ্ট্রীয় হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার বললে খুব বাড়িয়ে বলা হবে না। দলীয় সরকারের রাজনৈতিক অত্যাচার, নির্যাতন, জুলুম, শাসক গোষ্ঠীর অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের খবর সততার সঙ্গে তুলে ধরতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়েছে। রিপোর্টার থেকে সম্পাদক- কেউ বাদ যাননি নির্যাতন থেকে। অসংখ্য সাংবাদিক মির্মম হামলা, নির্যাতন এবং হয়রানির শিকার হয়েছেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ের হুমকিতে কোনো কোনো সাংবাদিক দেশ ছাড়তে পর্যন্ত বাধ্য হয়েছেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, সাংবাদিকরা নিজের ঘরে, বাইরে এবং কর্মক্ষেত্রে কোথাও আচ নিরাপদ বোধ করছেন না। গত এক যুগে পেশাগত কারণে যেসব সাংবাদিক খুন হয়েছেন, সেই খুনের বিচার আজও হয়নি।  খুন সভ্যসমাজ ও রাষ্ট্রেও হয়ে থাকে। সেখানে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুনিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে জোড়ায় জোড়ায় সাংবাদিক খুন হচ্ছে। বিচার তো দূরে থাক, খুনের তদন্তের কোনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই। সহকর্মীদের খুনের বিচারের দাবিতে সাংবাদিক সমাজকে রাজপথে আন্দোলন করতে হচ্ছে। সেখানেও তারা নিরাপদ নন। অবস্থা অমন পর্যায়ে গেছে যে, প্রকাশ্যে হামলা হয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের সমাবেশে। দুর্বৃত্তসমরা হামলা করেছে জাতীয় প্রেসক্লাবে গিয়েও।

পেশাগত দায়িত্বের কারণেই সাংবাদিকরা ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে নিজের সুখ-দুঃখ বিসর্জন দিয়ে

সমাজের অবহেলিত মানুষ থেকে শুরু করে গণতন্ত্র, মানবতা ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন

পেশাগত দায়িত্বের কারণেই সাংবাদিকরা ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে নিজের সুখ-দুঃখ বিসর্জন দিয়ে সমাজের অবহেলিত মানুষ থেকে শুরু করে গণতন্ত্র, মানবতা ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। তারা নিত্যদিন সংগ্রাম করেন শোষণ, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। সদা তৎপর থাকেন দেশ, জাতি ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে- সেই ব্যক্তিকে কেন এভাবে জীবন দিতে হয় আর হচ্ছে। কেন তাকে বিভিন্ন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়? এই অপোসহীন, সৎ সাংবাদিকের শত্রু কে বা কারা? এ জন্যই কিনা কিছুদিন আগে সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেছিলেন বাজিকরের কবলে পড়েছে দেশ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু রাজনৈতিক কারণে বেশির ভাগ সাংবাদিককে জীবন দিতে হচ্ছে। জেল, জুলুম, নির্যাতন, হয়রানি তো আছেই। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর শাসক গোষ্ঠীর একটি বৃহৎ অংশ সাংবাদিকদের প্রধান প্রতিপক্ষ। শাসক মহলের শোষণ, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং আধিপত্য বিস্তারের একমাত্র বাধা হচ্ছে মিডিয়া।  সমাজের প্রভাবশালীরা অবৈধ কায়েমী স্বার্থ রক্ষায় ও উদ্ধারে শাসকমহলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যে দুর্বৃত্তায়নের পথ রচনা করে, সেই পথের অন্যতম বাধাও সাংবাদিকরা। সরকারের ছত্রছায়ায় ও অদৃশ্য মদদে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সাংবাদিকদের দলনে লেলিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশের বিশেষ শাখা, র‌্যাব, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, ডিবিসহ দলীয় সন্ত্রাসীরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আদর্শিক, সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে সাংবাদিকদের ভিন্নপথে সরানোর চেষ্টা করে তারা। আপসহীন সাংবাদিকরা তখন নীতি ও আদর্শের সঙ্গে আপস করেন না। সত্য ও ন্যায় প্রকাশে অবিচল থাকেন। আর তখনই তার ওপর নেমে আসে নানা ধরনের অত্যাচার-নির্যাতন। এরই ফলস্বরূপ সে সাংবাদিককে হয় জীবন দিতে হবে অন্যথা দেশত্যাগে বাধ্য হবে। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর  দেড় ডজন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। দেশ ছেড়েছেন কয়েকজন। তারা মাতৃভূমি ত্যাগ করে প্রবাসে কষ্টকর জীবনযান করছেন আপনজন ছেড়ে।

সাগর-রুনি দম্পত্তি খুন হওয়ার আগে ২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর পল্টনের নিজের বাসায় বিশিষ্ট সাংবাদিক ফরদহাদ খাঁ ও তার স্ত্রীকে সন্ত্রাসীরা জবাই করে হত্যা করে।  রাজধানী ঢাকায় এই দুটি দম্পত্তি হত্যাকান্ডের আগে ৭ ডিসেম্বর  ২০১১ গাইবান্ধার  গোবিন্ধগঞ্জ উপজেলার কুকরাইল এলাকায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় দৈনিক ভোরের ডাকের গোবিন্ধগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি ফরিদুল ইসলাম রঞ্জুকে। ৭ এপ্রিল ২০১১ ঢাকার উত্তরা ও চট্টগ্রাম পোর্ট কলোনিতে খুন হন দুজন সাংবাদিক। চট্টগ্রামের পোর্ট কলোনি এলাকায় দৈনিক আজকের প্রত্যাশা ও আজকের সূর্যোদ্বয়ের সাংবাদিক মাহবুব টুটুলকে হত্যা করা হয়। একই দিন উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কের ১০ নম্বর বাসায় খুন করা হন সাপ্তাহিক বজ্রকণ্ঠের সাংবাদিক আলতাফ হোসেন। ২০১০ সালের ৯ মে গুপ্তহত্যার শিকার হন বেকরকারি টেলিভিশন এটিএন বাংলার সিনিয়র ক্যামেরাম্যান শফিকুল ইসলাম টুটুল। ২০১০ সালের ২৮ এপ্রিল খুন হন বিশিষ্ট সাংবাদিক ফতহে ওসমানী। ২০১০ সালের  ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে খুন হন বরিশালের মুলাদী প্রেসক্লাবের সভাপতি মনির হোনে রাঢ়ী। ২০০৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এনটিভির ভিডিও এডিটর আতিকুল ইসলাম আতিককে রাজধানীর মগবাজারে সন্ত্রাসীরা হত্যা করে। একই বছরের জুলাই মাসে ঢাকার পাক্ষিক মুক্তমনের স্টাফ রিপোর্টার নূরুল ইসলাম ওরফে রানা খুন হন।  আগস্টে গাজীপুরে খুন হন সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাহী সম্পাদক এস এম আহসান হাবিব বারী। ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দৈনিক ইনকিলাবের সংবাদদাতা ও রূপগঞ্জ প্রেসক্লাবের সহসভাপতি আবুল হাসান আসিফকে খুন করা হয়। ২০১২ সালে হবিগঞ্জে খুন করা হয় আরেক সাংবাদিককে। গত ১৫ জুন ২০১২ যশোরের শার্শা উপজেলার কাশীপুর গ্রামে নৃশংসভাবে খুন করা হয় সাংবাদিক জামাল উদ্দিনকে। হত্যার পর তার চোখ পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়। এ হত্যাকান্ডগুলো যে পরিকল্পিত, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর পেশাগত কারণে তারা প্রভাবশালীদের টার্গেটে পরিণত হন, তা বুঝা যায় সহজেই।

এর আগের বার শেখ হাসিনা প্রথম দফা ক্ষমতায় এলে প্রায় এক ও অভিন্নভাবে সাংবাদিক দলন, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। সে সময় সাংবাদিক নেতা বর্তমান বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত কবি ও সাংবাদিক কবি আবদুল হাই শিকদারের ওপর বর্বর হামলা হয়। তাদের বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন সাংবাদিক নেতারাসহ পরিবার-পরিজন। তবে তাৎক্ষণিক উন্নত চিকিৎসায় তারা প্রাণে বেঁচে যান। ১৯৯৬ সালের জুনে সাতক্ষীরায় খুন হন পত্রদূতের স্টাফ রিপোর্টার শ ম আলাউদ্দিন, ১৯৯৮ সালের ৩০ আগস্ট যশোরের দৈনিক রানার সম্পাদক সাইফুল আলম মুকুল খুন হন। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে খুন হন দৈনিক পূর্বাঞ্চলের স্টাফ রিপোর্টার হারুনার রশীদ খোকন। খুলনায় দৈনিক অনির্বাণের স্টাফ রিপোর্টার এস এম নাহের আলী ও সরদার শুকুর হোসেন খুন হন। এ ছাড়া ঝিনাইদহের বীরদর্পণ পত্রিকার মীর ইলিয়াস হোসেন দীলিপ, দৈনিক জনবাণীর রিপোর্টার বেলাল হোসেন, যশোরের দৈনিক রানারের সাংবাদিক গোলাম মাজেদ, এনটিভির রাঙামাটি প্রতিনিধি জামাল উদ্দিন, দৈনিক সংগ্রামের খুলনা ব্যুরো প্রধান শেখ বেলাল উদ্দিন, মৌলভীবাজারের ফারুক আহমদ, নীলফামারীর সাংবাদিক কামরুজ্জামানসহ নাম না জানা অনেক সাংবাদিক সে সময়ে খুন হন। এ বাইরে খুলনায় দৈনিক সংবাদের খুলনা ব্যুরো প্রধান মানিক সাহা ও দৈনিক জন্মভূমির সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালু নিজের অফিসে খুন হন, ২০০০ সালের ১৬ জুলাই দৈনিক জনকণ্ঠের যশোর প্রতিনিধি শামসুর রহমান কেবল নিজ কার্যালয়ে খুন হন। হিসাব কষলে এ সংখ্যা গাণিতিক হারে বাড়বেই।

দীর্ঘ এক যুগেও শেষ হয়নি শামসুর রহমান কেবল হত্যা মামলার বিচারকাজ। ৫ বছর ধরে মামলার বিচারকাজ স্থগিত হয়ে আছে। একইভাবে দীর্ঘ ১৩ বছরের শেষ হয়নি সাইফুল আলম হত্যা মামলা। উল্টো এ হত্যা মামলার সব আসামী জামিনে মুক্ত। তারা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বাদীর পরিবারের ওপর চাপ দিচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে মামলাটি কবর দেওয়ার অপচেষ্টা হচ্ছে বলে নিহত সাংবাদিকের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বরেণ্য এ সাংবাদিকদের হত্যাকান্ডের রহস্য আজও উন্মুচন করা হয়নি। উন্মুচন করা যায়নি হত্যাকারীদের মুখোশ। ফলে বিচারকাজও শুরু হয়নি। এ পর্যন্ত সাংবাদিক হত্যাকান্ডের জড়িতদের চিহ্নিত করা, বিচার সম্পন্ন কিংবা হত্যাকারীদের শাস্তি হওয়ার কোনো রেকর্ড নেই। ফলে সাংবাদিক হত্যাকান্ডের খতিয়ান দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে দীর্ঘ হচ্ছে।

সাংবাদিকদের হত্যার পাশাপাশি তাদের ওপর হামলা, মামলা, নির্যাতন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ভাইরাসের মতো দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এসব হামলা ও নির্যাতনের বেশির ভাগই রাজনৈতিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতেও লাঞ্ছিত হচ্ছেন সাংবাদিকরা। টিভি চ্যানেলের বিভিন্ন টক শোয় সঠিক তথ্য উপস্থাপন করায় ২০১১ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি  ইংরেজি দৈনিক নিউএজের সম্পাদক নূরুল কবীরকে মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। সঠিক তথ্য তুলে ধারায় এর আগে দৈনিক আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক আবুল আসাদ ও শীর্ষ নিউজ সম্পাদক একরামুল হককে নাভাবে নাজেহাল করা হয়। সরকারের বিরুদ্ধে অকাট্য তথ্য-প্রমাণসহ সংবাদ পরিবেশন করায় দৈনিক দিনকালের বার্তা সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য কামরুজ্জামানকে কয়েক দফা হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। সরকারি দলের একজন প্রভাবশাল এমপির নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা তাকে একাধিকবার অপহরণের চেষ্টাও চালায়। এমনকি হামলা চালায় তার আরামবাগের বাসায়ও। সেদিন বাসায় না থাকায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। সন্ত্রাসীরা তার বাসায় আসবাপত্র ভাঙচুর করে। এ ব্যাপারে থানায় জিডি করেও কোনো সহযোগিতা পাননি তিনি।  বরং প্রাণ বাঁচাতে রাতের অন্ধকারে তিনি বিদেশে পাড়ি জমান।

আজকের বাস্তবতায় দেশের বেশির ভাগ মিডিয়া সরকার সমর্থক হলেও মিডিয়ার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও খবরদারি চলছেই। দমন প্রক্রিয়া চলছে ভিন্ন কায়দায়। সরকারের গঠনমূলক আলোচনা, বস্ত্তনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ করাও কষ্টসাধ্য। সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ভয়াবহ দুর্নীতি, লুটপাট তুলে ধরায় অনেক মিডিয়া সরকারের রোষানলে পড়ে ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বেশ কয়েকজন সম্পাদক, প্রকাশক এবং সাংবাদিককে জেলে যেতে হয়েছে। এমনকি  রিমান্ডে নেয়ো হয়েছে আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও শীর্ষ নিউজের সম্পাদক একরামুল হককে। স্বাধীনতার পর বর্তমান সরকারের সময়ে কোনো সাংবাদিককে রিমান্ডে নেওয়ার নজির সৃষ্টি করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের এমপি, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতাদের ১৪টি বেসরকারি টিভির চ্যানেল লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। অথচ সরকার বেসরকারি টিভি চ্যানেল ওয়ানের সম্প্রচার বন্ধ করে রেখেছে। অন ইয়ারে আসতে দেওয়া হচ্ছে না যমুনা টিভিকে। জনপ্রিয় অনলাইন শীর্ষ নিউজ এবং শীর্ষ কাগজের  প্রকাশনা বাতিল করে সম্পাদক একরামুল হককে জেলে নিয়েছে। জনপ্রিয় দৈনিক আমার দেশের প্রকাশনা বাতিল করে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমাকে জেলে নিয়ে তার ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়। দেশের প্রথম অনলাইন দৈনিক ২৪ডটকম বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসীরা এর প্রধান কার্যালয়ে হামলা করে অফিস তছনছ করে ও সাংবাদিকদের ওপর নারকীয় হামলা চালায়। ইতিমধ্যে দেশে দুই শতাধিক সংবাদপত্র এসব কারণে আলোর মুখ দেখছে না বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। পাশাপাশি দেশের অত্যন্ত অঞ্চলের অনেক প্রেসক্লাব দখল করে রেখেছে সরকারদলীয় লোকজন। চাঁদপুরের জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক মেঘনা বার্তাকে দীর্ঘদিন কব্জা করে রাখা হয়। পরে দৈনিকটি হাইকোর্টে রিট করে দৈনিক আলো মুখ দেখে। বর্তমানে সরকারদলীয় লোকজন দৈনিকটির কার্যালয়ের বড় একটি অংশ জবরদখর করে রেখেছে। এক স্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে দৈনিকটির প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছেন দৈনিকটির তরুণ ও সাহসী সম্পাদক আবদুল আউয়াল রুবেল। কিন্তু এভাবে আর কত দিন।

একের পর এক সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন, হুমকি-ধামকি, হামলা-মামলা, দলন, সংবাদপত্র বন্ধ করে সাংবাদিকদের বেকার করা ক্ষমতাসীন মহাজোটের বড় শরিকের জন্য নতুন কিছু নয়। বরং এ এ সংস্কৃতি তাদের পুরনো। প্রথম দফা প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস, আনন্দ বিচিত্রা বন্ধ করে দেন। আর জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রা নিজের বোনের নামে নামমাত্র মূল্যে নিয়ে নেন। আর আগে শেখ হাসিনা পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ৪টি সংবাদপত্র নিজের নিয়ন্ত্রণে লিফলেট আকারে রেখে সমুদয় পত্রপত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা এবার ক্ষমতায় এসে বেশ কয়েকটি টিবি চ্যানেল ও পত্রিকা বন্ধের পাশাপাশি চলমান বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোয় চিঠি দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। দৈনিক দিনকাল, আমার দেশ, দৈনিক সংগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে সরকারি বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছেন। দৈনিক দিনকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, দলীয় অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি প্রধানন্ত্রীর অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নিষিদ্ধের মতো ঘটনাও ঘটেছে। সাংবাদিকদের খুন, প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করা, হয়রানি ও নির্যাতন কি এভাবে চলতে থাকবে? এর কি প্রতিকার হবে না। এর কি শেষ নেই। সাংবাদিকরা আর কতকাল এভাবে হামলা, মামলা ও হত্যাকান্ডের শিকার হবেন। ফলে সাংবাদিকরা আজ তাদের জীবনের নিরাপত্তা, অবাধ ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অপঘাতে নিহত সব সাংবাদিকের বিচারের দাবিতে রাজপথে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করছেন। নিরুপায় হয়ে তারা আজ আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন। এ ব্যাপারে দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।

এত কিছুর পর আবার সাংবাদিকদের প্রত্যাশিত ঐক্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। সুযোগসন্ধানী মহল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সাংবাদিক নেতাদের একটি অংশকে কাবু করতে সমর্থ হয়েছে। ফলে সাংবাদিকদের ওপর নেমে আসা মানবসৃষ্ট দুর্যোগকে পাশ কাটিয়ে ওই অংশটি সরে দাঁড়িয়েছে। ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন ঐক্যবিরোধী নানা বক্তব্য। এমনকি রাজনৈতিক সেস্নাগান দিয়ে এর সঙ্গে একমত না হলে তারা ঐক্যে থাকবেন না বলে অনেক কটূ কথা বলছেন! শুধু কি তাই, নিজেদের ঘোষিত সাগর-রম্ননির প্রথম হত্যাকা- বার্ষিকীর কর্মসূচিকে এড়িয়ে যাচ্ছেন ঠান্ডা মাথায়। সাগর-রম্ননির রক্তের সঙ্গে করা নিজেদের শপথ বেমালুম ভুলে যাচ্ছেন তারা। জাতীয় প্রেসক্লাবে এ ব্যাপারে সভা আহবান করেও তাদের সাড়া পাননি ট্রেড ইউনিয়নের বৈধ অংশের নেতারা। এমনকি এর পরদিন নিজে সময় দিয়েও আসেননি অন্য অংশের জনৈক শীর্ষ নেতা। সর্বশেষ ১০ মার্চ বিকেল ৪টা পর্যমত্ম অপেক্ষা করা নেতাদের ডাকে তারা আসেননি। তার পরও এ অংশের নেতাদের বিশ্বাস, তারা সাংবাদিক সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে ১১ মার্চের সমাবেশে আসবেন। তারা ধর্মঘট কর্মসূচি বাতিল করে ঐদিন সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ ডেকেছেন। যারা আসেননি, নাম উলেস্নখ করে তাদের খাটো করতে চাই না। সাংবাদিক সমাজ তাদের ভালো করেই চেনে এবং জানে। তবে ওই তিনটি বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন- রম্নহুল আমিন গাজী, শওকত মাহমুদ, আবদুস শহিদ, মুহাম্মদ বাকের হোসাইন, ইলিয়াস খান। অবাক-বিস্ময়ে সাংবাদিক সমাজ অনুপস্থিত নেতাদের এমন আচরণ ও কর্ম দেখে নিজের মাথার চুল ছিঁড়ছেন। নানাভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এসব দেখে সাগর-রম্ননির আত্মা যেন অভিশাপ না দেয়, সে প্রার্থনা করছি।

সম্প্রতি দৈনিক নয়া দিগমত্ম কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে দৈনিক আমার দেশ, সংগ্রাম, দিনকাল ও দিগমত্ম টিভি অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ একযোগ একই দিন সারাদেশে ৩১ জন সাংবাদিক পেশাগত দাযিত্ব পালন করতে গিয়ে আহত হয়েছেন। চ্যানেল আইয়ের দুজন সাংবাদিককে পিটিয়ে আহত করেছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতারা। দৈনিক সংগ্রামের চীফ ফটোগ্রাফার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য আবদুর রাজ্জাককে রিম্যান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। একই দৈনিক সংগ্রামের ৭ জন সাংবাদিক-কর্মচারীকে অফিস থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করেছে পুলিশ। দৈনিক নয়া দিগমত্ম, সংগাম  ও সাপ্তাহিক সোনার বাংলা অফিসে তলস্নাশী চালিয়ে সাংবাদিক-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। শাহবাগ থেকে সরকারের মদদপুষ্টরা দৈনিক আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে গ্রেফতারের মতো মামার বাড়ির আবদার করছে যেন। দিয়েছে স্মারকলিপি। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আমার দেশ, সংগ্রাম ও নয়া দিগমত্ম পত্রিকার কপি। হকারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে এসব পত্রিকা বিলি-বণ্টনে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম-গণতান্ত্রিক দেশে কখনো যা কাম্য হতে পারে না। শুধু কি তাই, সম্প্রতি একজন সাংবাদিককে খুন করে সন্ত্রাসীরা খ্যামত্ম হয়নি, তাকে ২০ টুকরো করেছে তারা। এ অবস্থায় সাংবাদিক সমাজের ঐক্য যখন বেশি প্রয়োজন, তখন খোঁড়া-ঠুনকো-অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য রেখে কাঙিক্ষত ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে যারা কেটে পড়ছে, তাদের সাংবাদিক সমাজ মনে রাখবে বৈকি। নেতারা সব ভুলে শুভ বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে অতীতের মতো ঐক্য বজায় রাখবেন, সর্বসত্মরের সাংবাদিক সমাজের এটাই প্রত্যাশা।

Print Friendly

©m01


সর্বশেষ খবর

পুরোনো খবর

SatSunMonTueWedThuFri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31      
     12
10111213141516
17181920212223
2425262728  
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
       
 123456
78910111213
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
15161718192021
22232425262728
2930     
       
    123
45678910
11121314151617
25262728   
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
      1
16171819202122
23242526272829
3031     
28293031   
       
      1
30      
282930    
       
     12
10111213141516
17181920212223
31      
   1234
19202122232425
2627282930  
       
    123
45678910
18192021222324
       
    123
18192021222324
       
28      
       
  12345
6789101112
       
2930     
       
    123
11121314151617
       
  12345
20212223242526
27282930   
       
   1234
       
       
       
   1234
12131415161718
       
     12
31      
      1
       
     12
3456789
       

ডেনাইটসংবাদ.কম দেশ বিদেশে ভিজিটর

Flag Counter
This is the head of your page. Example HTML page This is the body of your page.

as

shikha



প্রধান সম্পাদক:মোঃ নুরুল আমিন
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোঃসোহেল রানা
Chief Editor: Md. Norul Amin, Cell: 01711142317,
Publisher & Editor: Md.Sohel Rana, Cell:01933988098
Office:298/s aBhaban(7thFloor)Arambag,Motijheel,Dhaka,1000
Email:daynightsangbad1@gmail.com,daynightsangbad@yahoo.com




Developed & Tech Support by: