ডেনাইট সংবাদ » ভারতের পানি আগ্রাসন ও সরকারের নতজানু নীতির প্রতিবাদে জাতীয় কনভেনশন

২১শে জুন, ২০১৮ ইং | ৭ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

234-60

ভারতের পানি আগ্রাসন ও সরকারের নতজানু নীতির প্রতিবাদে জাতীয় কনভেনশন

প্রকাশিত হয়েছে: শুক্রবার, ২৩, মে, ২০১৪ ১০:৩৭ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। একসময় এদেশে ১২০০ নদীর নাম পাওয়া যেত। এখন ২৯০টি নামে থাকলেও বাসত্মবে চলমান নেই। শীতকালে ৬০/৬৫টির বেশি নদী প্রবাহমান থাকে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ২৫টি নদী সহসাই শুকিয়ে যাবে। ১৯৭১ সালে নদীপথের সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ২৪,০০০ কিলোমিটার হিসাবে থাকলেও এখন তা ৮,৪০০ কিলোমিটারও নেই। ভারত থেকে ৫৪টি ও বার্মা থেকে ৩টি, মোট ৫৭টি নদী নানা শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত। ভারত আমত্মর্জাতিক নিয়ম-নীতি লংঘন করে উজানে নিজেদের অংশে অধিকাংশ নদীতে বাঁধ দিয়েছে এবং একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে। পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা; প্রধান এই ৩টি নদীই ভারতের জল-আগ্রাসনের শিকার। ভারত পদ্মার উজানে ফারাক্কায় বাঁধ দিয়েছে। তিসত্মা নদীর উজানে সিকিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পশ্চিমবঙ্গে গজলডোবা ব্যারেজে পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে তিসত্মা প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। মেঘনার অন্যতম উৎস নদী সুরমা-কুশিয়ারার উজানে বরাক নদীতে টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আয়োজন চলছে। ব্রহ্মপুত্র দিয়ে এদেশের মোট পানিপ্রবাহের প্রায় ৬০% শতাংশ আসে। ভারত আমত্মঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে সেই ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে পানি সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে। এছাড়াও মনু, খোয়াই, মহানন্দা, গোমতী, মুহুরী, পাগলা, করতোয়া, জিঞ্জিরাম নদীর উজানে ভারত বাঁধ নির্মাণ করেছে। সিলেটের সারী নদীর উজানে মেঘালয়ে বাঁধ দিয়ে ১২৬ মেগাওয়াট মাইনথ্রু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রতি চালু করা হয়েছে। ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি নদীগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনেকগুলো জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ডিহিং বহুমুখী বাঁধ প্রকল্প (ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদীর ওপর), সুবানসিঁড়ি বহুমুখী বাঁধ প্রকল্প (ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদীর ওপর), লোহিত বহুমুখী বাঁধ প্রকল্প (ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদীর ওপর), যদুকাটা বহুমুখী বাঁধ প্রকল্প (মেঘনার শাখা নদীর ওপর), সোমেশ্বরী বহুমুখী বাঁধ প্রকল্প (মেঘনার শাখা নদীর ওপর), ভৈরবী বহুমুখী বাঁধ প্রকল্প (বরাক নদীর শাখার ওপর), নোয়া ডিহিং বহুমুখী বাঁধ প্রকল্প (ব্রহ্মপুত্রের শাখার ওপর), কুলশী বহুমুখী বাঁধ প্রকল্প (ব্রহ্মপুত্রের শাখার ওপর) ইত্যাদি। প্রত্যেকটি প্রকল্পেই কমবেশি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর।

এমনিতেই ফারাক্কার কারণে উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায় মরুকরণ এবং দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা শুরু হয়েছে। ভূপৃষ্ঠের পানি কমে যাওয়ায় এবং বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ও তাদের চাপানো ঋণের টাকায় বাড়তি দামে ডিপ টিউবয়েল, শ্যালো টিউবয়েল দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি অধিকমাত্রায় তোলার কারণে প্রায় ৩ কোটি মানুষ আর্সেনিক বিষযুক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে। তিসত্মা থেকে ভারতের মাত্রাতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের ফলে নদীটি মৃতপ্রায় প্রবাহে পরিণত হয়েছে। তিসত্মা ব্যারেজ ও সেচপ্রকল্প অকার্যকর হয়ে রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী জেলার ১২টি উপজেলার কৃষি সরাসরি ক্ষতিগ্রসত্ম হচ্ছে। এই মৌসুমেই কৃষকদের অমত্মত ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হলে সিলেটের হাওর অঞ্চল বিপর্যসত্ম হবে। এরপর ভারতে আমত্মঃনদীসংযোগ প্রকল্প বাসত্মবায়ন হলে বাংলাদেশ হবে মরুভূমি, আক্রামত্ম হবে লবণাক্ততায়। গোটা দেশের কৃষি, শিল্প, নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা, মৎস্য সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ধ্বংস হবে। আর্সেনিক বিষ ছড়িয়ে পড়বে সারাদেশে। শাসক দলগুলোর কেউ ভারতপ্রীতি, আবার কেউ সসত্মা ভারতবিরোধী শ্লোগান দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করলেও এ বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। শাসকরা এ বিষয়গুলো নিয়ে দায়িত্বহীন ঔদাসীন্য দেখিয়ে কার্যত ভারতের অন্যায্য উদ্যোগকেই সহায়তা করে চলেছে।

স্বাধীনতার এত বছর পর মাত্র কিছুদিন আগে বাংলাদেশে যে পানি নীতি গ্রহণ করা হয়েছে তার আসল উদ্দেশ্য পানিসম্পদের বেসরকারিকরণ ও পানিতে ব্যক্তিগত মালিকানার স্বীকৃতি দেয়া, জনগণের সার্বভৌম অধিকারের বদলে তাকে বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করা। দেশের নদী-খাল, হাওড়-বাওড় যেগুলো দখল হয়ে গেছে সেগুলো উদ্ধার করা হচ্ছে না। মাঝে মাঝে কিছু লোকদেখানো উদ্যোগ ছাড়া নদী-খাল খনন ও ভূপৃষ্ঠে পানি সংরক্ষণ এবং সংরক্ষিত পানির পরিমাণ বাড়ানোর বাসত্মব কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই। একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার অধীনে খরা-বন্যা-ভাঙন প্রতিরোধের অংশ হিসাবে কাজ না করে অপরিকল্পিতভাবে নদী ড্রেজিং, খাল খনন, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, স্লুইস গেট নির্মাণ ইত্যাদি কাজে ব্যাপক দুর্নীতির চিত্র সংবাদপত্রে প্রায়ই প্রকাশিত হয়। বর্ষাকাল আসলেই নদীভাঙন রোধের তোড়জোড় পড়ে যায়। চাঁদপুর-সিরাজগঞ্জসহ সারাদেশে এইভাবে সরকারি টাকা আত্মসাতের উৎসব চলে। অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, রাসত্মা-ঘাট, পুল নির্মাণ নদীর গতিপথকে বাধাগ্রসত্ম করছে। শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় নদী-খাল-বিল-জলাশয় দখলের মহোৎসব চলেছে। আর পাল্লা দিয়ে চলছে নদীর দূষণ। শুধু ঢাকার আশেপাশে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীর একটা বড় অংশ দখল এবং ভরাট হয়ে গেছে আর প্রায় সাত হাজার ছোট-বড় শিল্প-কলকারখানার বর্জ্যে পানি সীমাহীন মাত্রায় দূষিত হচ্ছে।

আমাদের পানির উৎস প্রধানত তিনটি : আমত্মর্জাতিক নদীপ্রবাহ, বৃষ্টি এবং ভূগর্ভস্থ পানি। এর মধ্যে নদীপ্রবাহের অবদান দু’তৃতীয়াংশের বেশি (৭৬.৫%)। বাকি দু’টোর অবদান যথাক্রমে ২৩% ও ১.৫%। বলা বাহুল্য, সাগরের পাশাপাশি নদীর পানি বাষ্পীভূত হয়েই বৃষ্টিতে পরিণত হয়। ভূগর্ভস্থ পানির ভান্ডারেও নদীর অবদান বিশাল। আবার, নদীপ্রবাহের মাধ্যমে দেশে যে পরিমাণ পানি আসে তার ৯০ শতাংশেরও বেশি বহন করে তিনটি প্রধান নদী – ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, মেঘনা। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র একাই আনে ৬০-৭০% পানি। পৃথিবীতে মিঠা পানির সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, তাই অনেকের মতে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে পানির জন্য। বাংলাদেশ মিঠা পানির এক অমূল্য ভান্ডার। অথচ জনস্বার্থে এই সম্পদ সংরÿণ ও ব্যবহারের কোন কার্যকর উদ্যোগ বা পরিকল্পনা শাসকদলগুলোর নেই। আমাদের দেশের নদীগুলো দিয়ে বছরে কী পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কত, পানি প্রবাহ ও নদী-নালা-খাল-বিল-হাওড়-বাওড়ের ধারণক্ষমতার ভারসাম্য কতটুকু, নদী ভাঙন-বন্যা ও খরা রোধ করার জন্য কী করণীয়, ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কত, নদীগুলো দিয়ে কী পরিমাণ পলি আসে – ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সমন্বিত সমীক্ষার মাধ্যমে যে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাসত্মবায়ন করা প্রয়োজন ছিল, আজ পর্যমত্ম তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের সরকারের উচিত অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন প্রশ্নে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে ভারতের ওপর চাপ বজায় রাখা এবং আমত্মর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করা। পৃথিবীর অনেক বড় নদীই একাধিক দেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দ্বিপাক্ষিক-বহুপাক্ষিক বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য ১৯৬৬ সালে হেলসিংকিতে গৃহীত হয়েছে আমত্মর্জাতিক আইন বা নীতিমালা। এই নীতিমালার ৪ ও ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত দেশ, অভিন্ন নদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনা করবে। এ জন্য অবশ্যই যেন অন্য দেশের বড় কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। একই আইনের ২৯(২) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অভিন্ন নদীর ওপর যে কোনো প্রসত্মাবিত অবকাঠামোর নির্মাণ এবং ইনস্টলেশনের ব্যাপারে নদী অববাহিকায় অবস্থিত অন্য যে কোনো রাষ্ট্র, এই কাজের ফলে অববাহিকায় ঘটা পরিবর্তনের কারণে যার স্বার্থহানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে এ ব্যাপারে নোটিশ দিতে হবে। নোটিশ গ্রহীতা দেশটি যেন প্রসত্মাবিত পরিবর্তনের সম্ভাব্য ফলাফলের বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাবলী সরবরাহ করতে হবে। প্রয়োজনে ÿতিগ্রসত্ম দেশকে ÿতিপূরণ প্রদানের প্রসত্মাবও সেখানে আছে। প্রায় অনুরূপ কথা বলা হয়েছে ১৯৯৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘের জলপ্রবাহ কনভেনশনের (UN Convention on the Law of Non-Navigational Uses of International Water Courses) ১২ নম্বর আর্টিকেলে। ৩৫টি দেশ কর্তৃক রেটিফাই হলে এই কনভেনশনটি আইনে পরিণত হবে। এ পর্যমত্ম ৩৪টি দেশ অনুমোদন করেছে, বাংলাদেশ ও ভারত এখনো অনুমোদন করেনি। ভারত যে শুধু আমত্মর্জাতিক আইন, রীতি-নীতি লঙ্ঘন করেছে তাই নয়, ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত গঙ্গা চুক্তির অঙ্গীকারও লঙ্ঘন করেছে। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা হয়নি, কিন্তু তারপরও ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল উভয় দেশের সীমানার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত আমত্মর্জাতিক নদ-নদীর পানির অংশীদারিত্ব পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে করা এবং নিজ নিজ দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ, নদী অববাহিকার উন্নয়ন এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে উভয় দেশের জনগণের পারস্পরিক মঙ্গলের স্বার্থে জলসম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহারে উভয় দেশ সচেষ্ট থাকবে।

ভারত সরকার একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং নানা অজুহাতে অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন আলোচনা ঝুলিয়ে রেখে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে একে ব্যবহার করেছে। দাতা-গ্রহীতার সম্পর্কের ধারণা থেকে মুক্ত হয়েই পানিবণ্টন সমস্যা মীমাংসা করতে হবে, কারণ পানি বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার। তাছাড়া পানি বংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা। তিসত্মার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনার প্রেÿÿতে ২০১১ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘৪০ বছরে একটিমাত্র নদীর পানি ভাগাভাগি এবং আরেকটির অমত্মর্বর্তীকালীন চুক্তির কাছাকাছি এসেছি। এ হারে ৫৪টি অভিন্ন নদীর ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষরে দু’প্রতিবেশীর সময় লাগবে এক সহস্র বছর।’’ ভারত সব অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের সমন্বিত পরিকল্পনার বদলে একেকটি করে আলোচনা করছে। বাংলাদেশের প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার উৎস যথাক্রমে চীনের তিববত ও নেপালে। অভিন্ন নদীর পানি সমন্বিত ও যৌথ ব্যবস্থাপনা-ব্যবহার-উন্নয়ন-রক্ষণাবেক্ষণ এবং এ সংক্রামত্ম বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চীন, ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে যৌথ অববাহিকা কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। ইউরোপে রাইন নদীর অববাহিকায় যত দেশ আছে সবাই মিলে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে যৌথ কমিশন গঠন করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৬টি দেশ নিয়ে একইভাবে মেকং রিভার কমিশন কাজ করছে। ভারত-পাকিসত্মানের মধ্যেও সিন্ধু জলধারার পানি বন্টনের জন্য বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সমঝোতা অনুযায়ী সিন্ধু নদ কমিশন কাজ করছে ১৯৬০ সাল থেকে। সম্প্রতি চীন কর্তৃক ব্রহ্মপুত্রের উৎস সাংপো নদীর উপর বাঁধ দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের ঘোষণায় ভারত সরকার জোরালো আপত্তি জানিয়েছে এবং বাংলাদেশের জন্যও তা অত্যমত্ম উদ্বেগজনক। ভারত ও বাংলাদেশে প্রধান নদীগুলোর পানি কমে যাওয়ার সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ইতোপূর্বে নেপালের পাহাড়ী এলাকায় জলাধার নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়ানোর প্রসত্মাব দিয়েছিল। এর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হলেও এ ধরনের বহু-রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা দরকার।

ভারত-বাংলাদেশ দু’দেশের মানুষেরই পানি প্রয়োজন এবং এ প্রয়োজন দিন দিন বাড়বে। ফলে দু’দেশের মানুষের অভিন্ন স্বার্থে নদী রক্ষায় পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ দরকার। এক্ষেত্রে একটি বিষয় আমরা উল্লেখ করতে চাই, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের মতো একটি জনগুরম্নত্বপূর্ণ বিষয় শুধুমাত্র দু’দেশের সরকারি মহলের উপর ছেড়ে দেয়া যায় না। কারণ ভারতের শাসকগোষ্ঠী নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে কখনো আধিপত্যবাদী রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে পানিসমস্যাকে কাজে লাগিয়েছে, কখনো সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার নামে পানির বিনিময়ে নানা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছে। একইভাবে বাংলাদেশের সরকারগুলোও কখনো নতজানু নীতি অনুসরণ করে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে, কখনো ভারতবিরোধিতার নামে সাম্প্রদায়িক উস্কানির আড়ালে বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে পরিণত করেছে। এভাবে জনগণের জীবন-জীবিকার সংকট বেড়েছে, সমস্যা জটিলতর হয়েছে এবং দু’দেশের জনসাধারণের মধ্যে বিরোধ-বৈরিতা সৃষ্টি করেছে। ফলে আমাদের দাবি – পানিসমস্যা সংক্রামত্ম আলোচনায় সরকার ও সরকারি বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি দু’দেশের বেসরকারি পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ এবং সকল গণতান্ত্রিক দল ও সংশ্লিষ্ট সব মহলের মতামত নিতে হবে। সর্বোপরি, সমসত্ম বিষয় দু’দেশের জনগণকে খোলামেলা জানাতে হবে, আমলাতান্ত্রিক অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধামত্ম নেয়া যাবে না। দু’দেশের জনগণ ও সচেতন মহলের চাপ সরকারগুলোকে জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নিতে কিছুটা হলেও বাধ্য করতে পারে।

নদীসংযোগ প্রকল্প, টিপাইবাঁধসহ ভারতের অন্যান্য পরিকল্পনা নিয়ে দেশের ভেতরে যেমন সর্বব্যাপক সচেতনতা ও জনমত গড়ে তুলতে হবে, তেমনি ভারতের গণতন্ত্রমনা-প্রগতিশীল জনগণ এবং রাজনৈতিক শক্তির সাথেও আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ ভারতের শাসকগোষ্ঠী আর ভারতের জনসাধারণ এক নয়।

বর্তমান সরকার ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যমত্মরে নৌবন্দর ও রাসত্মা ব্যবহারের সুযোগ, বিদ্যুৎ করিডোর, রামপালে সুন্দরবন বিনাশী বিদ্যুৎপ্রকল্প, ভারতীয় বিদ্রোহীদের দমন, সমুদ্রের দুটি গ্যাসব্লক ভারতীয় কোম্পানিকে ইজারা ইত্যাদি নানা সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু তিসত্মাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা ভারতের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি। সীমামেত্ম বাংলাদেশি হত্যা, ছিটমহল বিনিময়সহ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। এখানকার বাজার ভারতীয় পণ্যে সয়লাব হয়ে গেছে। বর্তমান মহাজোট সরকার, অতীতের বিএনপি-জাতীয় পার্টি কোন সরকারই ভারতের কাছ থেকে অভিন্ন নদীর পানি আদায়ে দৃঢ় অবস্থান নেয়নি। শাসক বুর্জোয়া দলগুলো লুটপাট ও গদি দখল নিয়েই ব্যসত্ম, জাতীয় স্বার্থ-জনস্বার্থ বা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকার জন্য এ অঞ্চলের বৃহৎ শক্তি ভারতের শাসকশ্রেণীর আনুকূল্য লাভের জন্য আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রতিযোগিতা করে। বাংলাদেশের পুঁজিপতিরাও ভারতের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়িয়ে মুনাফা করতে চায়। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে এদেশের কৃষকসহ সাধারণ মানুষের জীবন ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বিপর্যসত্ম – এ নিয়ে তাদের জোরালো ও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। দেশের অভ্যমত্মরেও নদী-পানিসম্পদ রক্ষা ও কাজে লাগানোর দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা শাসকদের নেই। বরং শাসক দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় অবাধে চলছে নদী-জলাশয় দখল, দূষণ, নদীভাঙন-বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে লুটপাট ইত্যাদি। ভূ-গর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত তোলার কারণে আর্সেনিক দূষণের ঝুঁকিতে আক্রামত্ম কয়েক কোটি মানুষ। অন্যদিকে বিশুদ্ধ পানির সংকটকে পুঁজি করে চলছে পানি ব্যবসা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা করছে সরকার। তাই আজ নদী রক্ষার সংগ্রামের সাথে গণবিরোধী শাসকশ্রেণীর বিরম্নদ্ধে সংগ্রামকে যুক্ত করতে হবে।

দাবিসমূহ

  1. আমত্মর্জাতিক নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে পরিবেশ-প্রতিবেশের বিপর্যয়, কৃষির ক্ষতি, জীবন-জীবিকা ধ্বংস, মরুকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদির চিত্র ভারতের জনসাধারণের সামনে ও বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে। এর জন্য শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে।
  2. United Nations Convention on the Law of the Non-Navigational Uses of International Watercourses 1997 অবিলম্বে বাংলাদেশকে রেটিফাই করতে হবে। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় এই কনভেনশনকে আইনে পরিণত করতে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে।
  3. ফারাক্কা, গজলডোবা ও অন্যান্য বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে হিসাব করে ভারতের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি ও আমত্মর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন করতে হবে।
  4. ভারতের আমত্মঃনদীসংযোগ পরিকল্পনার বিরম্নদ্ধে আমত্মর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
  5. বর্ষাকালে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে নদী-খাল খনন কর, নদী-জলাশয় দখল বন্ধ ও উদ্ধার করতে হবে। ভূ-গর্ভস্থ পানির বদলে ভূ-পৃষ্ঠের পানি সংরক্ষণ ও সর্বোচ্চ ব্যবহার করে আর্সেনিক বিপদ প্রতিহত করতে হবে।
  6. অভিন্ন নদীর পানি সমন্বিত ও যৌথ ব্যবস্থাপনা-ব্যবহার-উন্নয়ন-রক্ষণাবেক্ষণ এবং এ সংক্রামত্ম বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে নিয়ে যৌথ অববাহিকা কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে। প্রতিটি অভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক পৃথক যৌথ কমিশন হতে পারে।
  7. বাংলাদেশের পানির প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট করতে হবে। প্রতিটি নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কি পরিমাণ প্রবাহ দরকার এবং কৃষিসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রয়োজনে কত পানি দরকার তার হিসাব থাকতে হবে।
  8. বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনকে সক্রিয় ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
Print Friendly

©m01


সর্বশেষ খবর

পুরোনো খবর

SatSunMonTueWedThuFri
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31      
     12
10111213141516
17181920212223
2425262728  
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
       
 123456
78910111213
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
15161718192021
22232425262728
2930     
       
    123
45678910
11121314151617
25262728   
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
      1
16171819202122
23242526272829
3031     
28293031   
       
      1
30      
282930    
       
     12
10111213141516
17181920212223
31      
   1234
19202122232425
2627282930  
       
    123
45678910
18192021222324
       
    123
18192021222324
       
28      
       
  12345
6789101112
       
2930     
       
    123
11121314151617
       
  12345
20212223242526
27282930   
       
   1234
       
       
       
   1234
12131415161718
       
     12
31      
      1
       
     12
3456789
       

ডেনাইটসংবাদ.কম দেশ বিদেশে ভিজিটর

Flag Counter
This is the head of your page. Example HTML page This is the body of your page.

as

shikha



প্রধান সম্পাদক:মোঃ নুরুল আমিন
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোঃসোহেল রানা
Chief Editor: Md. Norul Amin, Cell: 01711142317,
Publisher & Editor: Md.Sohel Rana, Cell:01933988098
Office:298/s aBhaban(7thFloor)Arambag,Motijheel,Dhaka,1000
Email:daynightsangbad1@gmail.com,daynightsangbad@yahoo.com




Developed & Tech Support by: